ইতিকাফ পালনের নিয়মাবলী
Share this
ইতিকাফ পালনের নিয়মাবলী: আসছে পবিত্র মাহে রমজান মাস। আল্লাহ তায়ালা যেই মাসটি আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। আর সেই মাসে যারা চাচ্ছেন, ইতেকাফ করতে। নিজের সকল পাপগুলোকে মুছে ফেলতে নতুন করে শুরু করতে আল্লাহর দিনে হাসতে ফিরে আসতে তাদের জন্যই আমাদের আজকের আর্টিকেল। আমাদের আজকের এই আর্টিকেলটিতে আমরা আলোচনা করব ইতিকাফ পালনের নিয়মাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত সকল তথ্য। যারা চাচ্ছেন এ বছর রমাজান মাসে এতেকাফ থাকতে মসজিদে এবং আল্লাহর পথে নিজেকে বিলীন করে দিতে তারা অবশ্যই এই আর্টিকেলটি সম্পন্ন পড়বেন।
Read More:-
- মাগরিবের নামাজ কয় রাকাত
- যোহরের নামাজ কয় রাকাত
- তারাবির নামাজের নিয়ম দোয়া ও মোনাজা
- ইফতারের দোয়া বাংলা উচ্চারণ
ইতিকাফ পালনের নিয়মাবলী
ইতিকাফ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা সঠিক নিয়ম মেনে পালন না করলে তার পূর্ণ সওয়াব পাওয়া যায় না। তাই ইতিকাফ শুরু করার আগে ও ইতিকাফ অবস্থায় কিছু মৌলিক নিয়ম জানা ও মানা অত্যন্ত জরুরি।
নিচে ধাপে ধাপে ইতিকাফ পালনের নিয়মাবলী তুলে ধরা হলো—
১. ইতিকাফের জন্য নিয়ত করা
ইতিকাফ পালনের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো নিয়ত।
- ইতিকাফ শুরু করার সময় মনে মনে এই নিয়ত করতে হবে—
“আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইতিকাফের নিয়ত করলাম।” - মুখে বলা জরুরি নয়, মনে মনে করলেই যথেষ্ট
- নিয়ত ছাড়া ইতিকাফ সহিহ হয় না
২. নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করা
ইতিকাফের জন্য নির্দিষ্ট স্থান ঠিক করতে হবে—
- পুরুষদের জন্য:
যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় হয়—এমন মসজিদে ইতিকাফ করতে হবে - নারীদের জন্য:
নিজ ঘরের ভেতরে নামাজের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় ইতিকাফ করা উত্তম (বাংলাদেশে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী)
ইতিকাফ চলাকালীন প্রয়োজন ছাড়া সেই স্থান ত্যাগ করা যাবে না।
৩. ইতিকাফের সময়সীমা মানা
- রমজানের শেষ দশ দিনের ইতিকাফ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা
- সাধারণত ২০ রমজান সূর্যাস্তের আগে মসজিদে প্রবেশ করে ইতিকাফ শুরু করা হয়
- ঈদের চাঁদ দেখা গেলে ইতিকাফ শেষ হয়
সময় পূর্ণ না করলে ইতিকাফ সম্পূর্ণ হয় না।
৪. ইবাদতে বেশি সময় ব্যয় করা
ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদতে পুরোপুরি মনোনিবেশ করা।
ইতিকাফ অবস্থায় যেসব আমল বেশি করা উচিত—
- ফরজ নামাজ জামাতে আদায়
- কুরআন তিলাওয়াত
- জিকির ও ইস্তিগফার
- দরুদ শরিফ
- দোয়া ও নফল নামাজ
অপ্রয়োজনীয় কথা, আড্ডা ও দুনিয়াবি কাজে সময় নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৫. শরিয়তসম্মত প্রয়োজন ছাড়া বের না হওয়া
ইতিকাফ অবস্থায় শুধু শরিয়তসম্মত প্রয়োজনেই ইতিকাফের স্থান ত্যাগ করা যাবে, যেমন—
- পেশাব-পায়খানা
- ফরজ গোসল
- অজু
- জরুরি খাবার সংগ্রহ (যদি বিকল্প না থাকে)
অপ্রয়োজনে বাইরে গেলে ইতিকাফ ভেঙে যেতে পারে।
৬. দুনিয়াবি কাজ ও গুনাহ থেকে বিরত থাকা
ইতিকাফ পালনের সময়—
- ব্যবসা-বাণিজ্য
- অযথা ফোন ব্যবহার
- গিবত, মিথ্যা, অনর্থক কথা
এসব থেকে বিরত থাকা জরুরি।
ইতিকাফ মানে শুধু মসজিদে থাকা নয়, নিজেকে গুনাহ থেকে দূরে রাখা।
৭. সহবাস ও কামভাব থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা
ইতিকাফ অবস্থায়—
- স্বামী-স্ত্রীর সহবাস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
- কামভাবসহ স্পর্শ বা চুম্বন থেকেও বিরত থাকতে হবে
এসব করলে ইতিকাফ ভেঙে যায়।
৮. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও আদব রক্ষা করা
- শরীর ও কাপড় পরিষ্কার রাখা
- মসজিদের আদব মানা
- অন্য মুসল্লিদের কষ্ট না দেওয়া
- শব্দ কম রাখা
এগুলো ইতিকাফের শিষ্টাচারের অংশ।
সংক্ষেপে ইতিকাফ পালনের মূল নিয়মাবলী
✔ নিয়ত করা
✔ নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান
✔ সময় পূর্ণ করা
✔ বেশি বেশি ইবাদত
✔ অপ্রয়োজনীয় কাজ বর্জন
✔ গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা
ইতিকাফ ভেঙে গেলে কী করতে হবে?
ইতিকাফ ভেঙে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেকেই জানেন না—ইতিকাফ ভেঙে গেলে করণীয় কী। এখানে বিষয়টি ইতিকাফের ধরন অনুযায়ী পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি।
১) সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ইতিকাফ ভেঙে গেলে
(রমজানের শেষ ১০ দিনের ইতিকাফ)
- যদি কোনো শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া ইতিকাফ ভেঙে যায়, তাহলে—
- ঐ ইতিকাফ ভেঙে গেছে বলে গণ্য হবে
- পরে এক দিনের কাজা ইতিকাফ আদায় করা ওয়াজিব হবে
- কাজা ইতিকাফ করতে হবে—
- একটি রোজা রেখে
- সূর্যাস্ত থেকে পরদিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত
মনে রাখতে হবে, পুরো ১০ দিনের কাজা নয়—শুধু এক দিনের কাজা করতে হয়।
২) ওয়াজিব ইতিকাফ (মানত করা) ভেঙে গেলে
- কেউ যদি মানত করে ইতিকাফ করে এবং তা ভেঙে যায়—
- পুরো মানতকৃত ইতিকাফ পুনরায় আদায় করতে হবে
- যত দিনের মানত ছিল, ঠিক তত দিনই কাজা করতে হবে
৩) নফল ইতিকাফ ভেঙে গেলে
- নফল ইতিকাফ ভেঙে গেলে—
- গুনাহ হয় না
- তবে চাইলে আবার নতুন করে ইতিকাফ শুরু করা যায়
ইতিকাফ ভাঙলে করণীয় সংক্ষেপে
✔ ভুল বুঝলে তওবা ও ইস্তিগফার
✔ সুন্নত/ওয়াজিব হলে কাজা আদায়
✔ ভবিষ্যতে সতর্ক থাকা
ইতিকাফে নিষিদ্ধ কাজের তালিকা
ইতিকাফ শুধু মসজিদে অবস্থান করা নয়, বরং কিছু নির্দিষ্ট কাজ থেকে বিরত থাকাও ইতিকাফের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিচে ইতিকাফ অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হলো—
১. স্বামী-স্ত্রীর সহবাস
- ইতিকাফ অবস্থায় সহবাস করলে—
- ইতিকাফ সরাসরি ভেঙে যায়
- এমনকি কামভাবসহ স্পর্শ বা চুম্বন থেকেও বিরত থাকা জরুরি
২. প্রয়োজন ছাড়া ইতিকাফের স্থান ত্যাগ করা
নিম্নোক্ত কারণ ছাড়া বের হওয়া নিষিদ্ধ—
- বাজার করা
- আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা
- আড্ডা বা ঘোরাঘুরি
✔ শুধু এই কারণে বের হওয়া যাবে—
- পেশাব-পায়খানা
- ফরজ গোসল
- অজু (যদি মসজিদে ব্যবস্থা না থাকে)
৩. দুনিয়াবি কাজকে প্রাধান্য দেওয়া
- ব্যবসা-বাণিজ্য
- মোবাইলে অযথা সময় কাটানো
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে থাকা
এগুলো ইতিকাফের রূহ বা আত্মা নষ্ট করে দেয়।
৪. গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়া
ইতিকাফ অবস্থায় এগুলো কঠোরভাবে বর্জনীয়—
- গিবত (পরনিন্দা)
- মিথ্যা কথা
- ঝগড়া-বিবাদ
- অহেতুক হাসি-ঠাট্টা
ইতিকাফ মানেই নিজেকে গুনাহ থেকে হেফাজত করা।
৫. অশালীন কথা ও অনর্থক আলাপ
- অপ্রয়োজনীয় গল্প
- দুনিয়াবি আলোচনা
- উচ্চস্বরে কথা বলা
এসব ইতিকাফের আদবের খেলাফ।
৬. ইচ্ছাকৃতভাবে ইতিকাফের নিয়ত ভেঙে দেওয়া
- মনে মনে সিদ্ধান্ত নেওয়া—“আমি আর ইতিকাফ করছি না”
- এমন নিয়ত করলেই ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যায়
আমাদের শেষ কথা
আশা করি আমাদের আজকের আর্টিকেল পড়ার পরে আপনি ইতিকাফ পালনের নিয়মাবলী সম্বন্ধে সকল কিছু জানতে পেরেছেন। তাই আপনার পরিচিত বন্ধুদের সঙ্গে অবশ্যই আর্টিকেলটি শেয়ার করে তাদেরকেও জানার সুযোগ করে দিবেন। ইতিকাফ পালনের নিয়মাবলী মেনে চললে এই ইবাদত আল্লাহর কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য হয়। এটি একজন মুসলমানকে আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অনন্য সুযোগ করে দেয়। তাই ইতিকাফ শুধু অবস্থান নয়, বরং ইবাদত ও চরিত্র সংশোধনের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ।




