ফজরের নামাজ কয় রাকাত, পড়ার সময়, নিয়ম
Share this
ফজরের নামাজ ইসলামের পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের মধ্যে প্রথম নামাজ, যা প্রতিদিনের ইবাদতের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই নামাজ সুবহে সাদিকের পর থেকে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত আদায় করা যায়। ফজরের নামাজ মোট চার রাকাত নিয়ে গঠিত, যার মধ্যে দুই রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদা (নিয়মিত সুন্নত) এবং দুই রাকাত ফরজ।
ফজরের নামাজের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি, এবং এটি অন্যান্য নামাজের তুলনায় বিশেষ ফজিলত ও মর্যাদা বহন করে। এই নামাজ যথাযথভাবে আদায় করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব হয় এবং বান্দা অসংখ্য সওয়াব লাভ করে। ফজরের নামাজ শুধু দুনিয়ার কল্যাণ নয়, আখিরাতের মুক্তির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি মুমিনের জন্য বরকতময় জীবন ও নিরাপত্তার প্রতীক এবং শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্তির অন্যতম মাধ্যম।
Read More:-
- মাগরিবের নামাজ কয় রাকাত
- যোহরের নামাজ কয় রাকাত
- তারাবির নামাজের নিয়ম দোয়া ও মোনাজা
- ইফতারের দোয়া বাংলা উচ্চারণ
ফজরের নামাজ কয় রাকাত ও কি কি
| ২ রাকাত | সুন্নতে মুয়াক্কাদা |
| ২ রাকাত | ফরজ |
ফজরের নামাজ পড়ার সময়
ফজরের নামাজের সময় শুরু হয়: ফজরের নামাজ শুরু হয় সুবহে সাদিক, অর্থাৎ ভোরের প্রথম আলো ফোটার সময় থেকে। এই সময়টি হলো যখন পূর্ব দিগন্তে সাদা আলো দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
ফজরের নামাজের সময় শেষ হয়: ফজরের নামাজ শেষ হয়ে যায় সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত। অর্থাৎ, যখন সূর্য দিগন্ত থেকে পুরোপুরি উঠতে শুরু করে, তখন ফজরের নামাজের সময় শেষ হয়ে যায়।
ফজরের নামাজের নিয়ম
ফজরের নামাজ ইসলামের পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের মধ্যে অন্যতম এবং এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন ও হাদিসে ফজরের নামাজের বিশেষ গুরুত্ব এবং ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ বলেছেন:
যে ব্যক্তি এশা নামাজ জামাতে পড়ে, সে যেন রাতের অর্ধেক ইবাদত করল। আর যে ফজরের নামাজ জামাতে পড়ে, সে যেন পুরো রাত ইবাদত করল।”
ফজরের নামাজের সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতি
ফজরের নামাজ মোট ৪ রাকাত, এর মধ্যে ২ রাকাত সুন্নত (নাজাম) এবং ২ রাকাত ফরজ। সুন্নত ও ফরজ নামাজের নিয়ম প্রায় এক ধরনের। যদি কেউ ইমামের পিছনে ফরজ নামাজ পড়ে, তবে তার ইমামের অনুসরণ করতে হবে। আর যদি একা পড়েন, তবে নিচের নিয়ম অনুসরণ করবেন।
ফজরের ২ রাকাত সুন্নত ও ২ রাকাত ফরজ নামাজ পড়ার নিয়ম
১ম রাকাত
নিয়ত করা: নামাজ শুরু করার আগে নিয়ত করতে হবে। নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা বাধ্যতামূলক নয়, মনে মনে নিয়ত করলেই হবে।
তাকবির: “আল্লাহু আকবার” বলে হাত তুলে তাকবির তহরিমা বলুন এবং হাত বাঁধুন।
সানা পাঠ করা: “সুবহানাকা আল্লাহুম্মা…” বলে সানা পড়ুন।
সূরা ফাতিহা পড়া: এরপর সূরা আল-ফাতিহা পড়ুন।
অন্য সূরা পড়া: সূরা ফাতিহার পরে কোনো এক সূরা (যেমন সূরা ইখলাস, সূরা ফিল ইত্যাদি) পড়ুন।
রুকু: রুকুতে গিয়ে বলুন, “সুবহানা রব্বিয়াল আজিম”।
সোজা হয়ে দাঁড়ানো: রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলুন, “সামি’আল্লাহু লিমান হামিদাহ”।
সিজদাহ: প্রথম সিজদায় গিয়ে বলুন, “সুবহানা রব্বিয়াল আ’লা”।
বসা: সিজদার পর বসুন এবং কিছু সময় এখানে অবস্থান করুন।
দ্বিতীয় সিজদাহ: দ্বিতীয় সিজদাহ আদায় করুন এবং সিজদার সময়ও “সুবহানা রব্বিয়াল আ’লা” বলুন।
২য় রাকাত
দাঁড়িয়ে সূরা ফাতিহা পড়া: দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে সূরা ফাতিহা পড়ুন।
অন্যান্য সূরা পড়া: সূরা ফাতিহার পর অন্য একটি সূরা (যেমন সূরা ইখলাস বা অন্য কোনো সূরা) পড়ুন।
রুকু: তারপর রুকুতে গিয়ে “সুবহানা রব্বিয়াল আজিম” বলুন।
সোজা হয়ে দাঁড়ানো: রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলুন, “সামি’আল্লাহু লিমান হামিদাহ”।
সিজদাহ: প্রথম সিজদায় গিয়ে বলুন, “সুবহানা রব্বিয়াল আ’লা”।
বসা: সিজদার পর বসুন।
দ্বিতীয় সিজদাহ: দ্বিতীয় সিজদা আদায় করুন।
আত্তাহিয়াতু, দরুদ শরীফ ও দোয়া মাসুরা: দ্বিতীয় সিজদার পর আত্তাহিয়াতু, দরুদ শরীফ এবং দোয়া মাসুরা পড়ুন।
সালাম ফেরানো: শেষ করার জন্য ডানে এবং বামে সালাম ফেরান, “আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ”।
ফজরের নামাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এর নিয়ম এবং পদ্ধতি সঠিকভাবে জানলে নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত বৃদ্ধি পায়।
ফজরের নামাজের পর আমল ও দোয়া
ফজরের নামাজের পর কিছু বিশেষ আমল করলে আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভ করা যায়। কুরআন ও হাদিসে ফজরের নামাজের পর দোয়া, জিকির ও অন্যান্য আমলের ব্যাপারে বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ ফজরের নামাজের পর সরাসরি ঘুমাতেন না, বরং আল্লাহর জিকির-আজকার করতেন এবং সাহাবাদের সাথে বসে আলাপ-আলোচনা করতেন।
ফজরের পর বিশেষ আমল
দুই রাকাত ইশরাক নামাজ পড়া: ফজরের নামাজের পর কিছু সময় বসে আল্লাহর জিকির করা এবং সূর্যোদয়ের ১০-১৫ মিনিট পর ২ বা ৪ রাকাত ইশরাক নামাজ পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। ইশরাক নামাজের মাধ্যমে বিশেষ সওয়াব লাভ হয় এবং এটি দিনের প্রথম সবার চেয়ে উত্তম আমল হিসেবে গণ্য হয়।
দোয়া
ফজরের নামাজের পর দোয়া পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু বিশেষ দোয়া রয়েছে, যা ফজরের নামাজের পর পড়লে অসীম বরকত ও সওয়াব পাওয়া যায়।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ দোয়া
“اللهم أنت السلام ومنك السلام تباركت يا ذا الجلال والإكرام”
অর্থ: “হে আল্লাহ! তুমি শান্তি, শান্তি তোমার কাছ থেকেই আসে, তুমি বরকতময়, হে মহিমা ও সম্মানের অধিকারী।” (মুসলিম, হাদিস: ৫৯২)
১০০ বার পড়ার দোয়া
“সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি”
যে ব্যক্তি ফজরের পর ১০০ বার “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি” বলবে, তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার মতোই হোক। (বুখারি)
জিকির ও তাসবিহ
ফজরের নামাজের পর কিছু বিশেষ জিকির ও তাসবিহ পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
আস্তাগফিরুল্লাহ – ১০০ বার
সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার – প্রতি একটি ৩৩ বার
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ও হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির – ১০ বার
এই জিকিরগুলি পড়ার মাধ্যমে পাপ মাফ হয়ে যায় এবং বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে।
কুরআন তিলাওয়াত করা
ফজরের সময় কুরআন তিলাওয়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময় ফেরেশতারা উপস্থিত থাকেন এবং তারা বান্দার আমলসমূহ আল্লাহর কাছে পেশ করেন। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“নিশ্চয়ই ফজরের কুরআন তিলাওয়াত সাক্ষ্যপ্রাপ্ত হয়।” (সূরা আল-ইসরা: ৭৮)
ফজরের নামাজের পর বিভিন্ন দোয়া ও আমল করলে আল্লাহর অসীম রহমত ও বরকত লাভ করা যায়। এসব আমল যেমন আল্লাহর কাছে সওয়াবের সঞ্চয় করে।
ফজরের নামাজের ফজিলত
ফজরের নামাজ ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নামাজ এবং কুরআন ও হাদিসে এর বহু ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এটি মুমিনদের জন্য এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত, যার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভ করা সম্ভব। আল্লাহ তাআলা বলেন:
নিশ্চয়ই ফজরের কুরআন (তিলাওয়াত) উপস্থিত হওয়ার যোগ্য।” (সূরা আল-ইসরা: ৭৮)
ফজরের পর ফেরেশতাদের সাক্ষী থাকা:
ফজরের নামাজের সময় ফেরেশতারা উপস্থিত হন এবং তারা এই নামাজের সাক্ষী থাকেন, যা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।
ফজরের দুই রাকাত সুন্নত দুনিয়া ও এর সমস্ত কিছু থেকেও উত্তম।”
অর্থাৎ, ফজরের নামাজের দুই রাকাত সুন্নত এত মূল্যবান যে, এটি পুরো পৃথিবী ও তার সমস্ত সম্পদ থেকেও উত্তম।
ফজরের নামাজের দুই রাকাত সুন্নতের বিশেষ মর্যাদা: নবী করিম বলেছেন:
এছাড়া আল্লাহ বলেন:
“নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের জন্য নির্ধারিত সময়েই ফরজ করা হয়েছে।” (সূরা আন-নিসা: ১০৩)
অর্থাৎ, ফজরের নামাজ সঠিক সময়ে আদায় করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য এবং এটি ফরজ।
ফজরের নামাজে সারারাত ইবাদতের সওয়াব: নবী করিম বলেছেন:
যে ব্যক্তি ফজরের ও আসরের নামাজ পড়বে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
অর্থাৎ, ফজরের নামাজ আদায় করলে সারারাতের ইবাদতের সওয়াব অর্জিত হয় এবং জান্নাতে প্রবেশের পথ সুগম হয়।
ফজরের নামাজ আল্লাহর হেফাজতে থাকার উপায়: রাসূলুল্লাহ বলেছেন:
যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ পড়ে, সে সারাদিন আল্লাহর নিরাপত্তায় থাকে।
অর্থাৎ, ফজরের নামাজ আদায় করার মাধ্যমে মুমিন সারাদিন আল্লাহর হেফাজতে থাকে এবং তার উপর আল্লাহর আশীর্বাদ ও সুরক্ষা বর্ষিত হয়।
ফজরের নামাজে অন্ধকারে ওঠার মর্যাদা:
যারা অন্ধকারে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের জন্য বিশেষ আলো দান করবেন।
ফজরের নামাজ শুধুমাত্র একটি ফরজ ইবাদত নয়, বরং এটি মুসলিম জীবনে বারবার আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের সুযোগ এনে দেয়।
ফজরের নামাজ শেষে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ একটি মহান জিকির, যা গুনাহ মাফ, বিপদ থেকে মুক্তি এবং জান্নাতের দরজা খোলার অন্যতম মাধ্যম। তাই, আমাদের উচিত প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর নিয়মিত এই জিকির করা।
“لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ”
বাংলা অর্থ:
আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্যিকার উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই, সমস্ত রাজত্ব তাঁরই, সমস্ত প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
ফজরের পর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার ফজিলত
গুনাহ মাফ হয়:
এই জিকির পাঠের মাধ্যমে পাপসমূহ মাফ হয়ে যায়।
এটি সর্বোত্তম তাসবিহ:
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রাপ্ত তাসবিহ, যা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয়।
এটি কিয়ামতের দিন সবচেয়ে ওজনদার আমল:
এই জিকির কিয়ামতের দিন অত্যন্ত ওজনদার আমল হিসেবে গণ্য হবে।
আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়:
নিয়মিত এই জিকির পাঠ করলে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়।
জান্নাতের দরজা খোলা থাকে:
এটি জান্নাতের দরজা খুলে দেয় এবং জান্নাতে প্রবেশের জন্য একটি মাধ্যম।
জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ হয়:
এই আমল জান্নাতে উঁচু মর্যাদা অর্জন করার পথ খুলে দেয়।
এটি সবচেয়ে উত্তম দোয়া:
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার মাধ্যমে এটি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে উত্তম দোয়া হিসেবে গণ্য হয়।
বিপদ–আপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়:
এই জিকির বিপদ ও কঠিন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
এটি জান্নাতে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ আমল:
এই আমলটি জান্নাতে প্রবেশের সহজতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত।
ফজরের নামাজের পর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ‘ পাঠ করলে আল্লাহর রহমত ও বরকত বেশি পরিমাণে আসে এবং সারা দিনব্যাপী শান্তি ও সুরক্ষা পাওয়া যায়।




