জানাজার নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও দোয়া
Share this
মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার আগে মৃতকে সামনে রেখে চার তাকবীরে যে নামাজ আদায় করা হয়, তাকে জানাযা নামাজ বলে। এই নামাজ হচ্ছে ফরজে কেফায়া। ইহা এক দুইজনে আদায় করলেও সকলের আদায় হয় কিন্তু কেহ আদায় না করলে সকলেই গুণার ভাগিদার হয়। জানাজার নামাজ ইসলামের একটি অপরিহার্য ধর্মীয় আমল। এই নামাজটি মূলত মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া হিসেবে করা হয়,মৃতের জন্য হেদায়াত, মাগফিরাত ও আল্লাহর দয়ার আবেদন জানাতে আদায় করা হয়।
জানাযা নামাজ পড়ার নিয়ম
জানাজার নামাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা মুসলিমের মৃত্যুর পর তার জন্য দোয়া ও মাগফিরাত কামনা করে আদায় করা হয়। নিচে জানাজার নামাজের নিয়ম বর্ণনা করা হলো:
মৃত ব্যক্তিকে একটি খাটিয়ায় রাখার সময় তাকে উত্তর-দক্ষিণ দিকের দিকে মুখ করে রাখাটা জরুরি। ইমাম মৃত ব্যক্তির বুকের সামনের দিকে দাঁড়িয়ে থাকবেন, এবং মুক্তাদিরা তার পেছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে জানাজার নামাজ আদায় করবেন।
জানাজার নামাজের নিয়ত
জানাজার নামাজের নিয়ত মন থেকে করতে হয়, মুখে উচ্চারণ করার প্রয়োজন নেই। তবে বুঝতে সহজতার জন্য নিচে আরবি, বাংলা উচ্চারণ এবং অর্থসহ দেওয়া হলো। যারা আরবি পড়তে পারেন না, তারাই শুধু বাংলায় উচ্চারণ বা অর্থ পড়লে হবে-

বাংলা অর্থ: আমি আল্লাহর জন্য চার তাকবিরসহ জানাজার নামাজ ফরজে কেফায়া আদায় করার নিয়ত করছি। আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও নবীর প্রতি দরূদ এবং এই মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করছি, এই ইমামের পেছনে কাবার দিকে মুখ করে। আল্লাহু আকবার।
বি.দ্র: এখানে “লেহাযাল মাইয়্যেতে” শব্দটি পুরুষ লাশের জন্য ব্যবহৃত হবে আর যদি মৃত ব্যক্তি নারী হয়, তবে “লেহাযিহিল মাইয়্যেতে” ব্যবহার করতে হবে।
আরো পড়ুন: জুমার নামাজের নিয়ত ও জুমার নামাজ কত রাকাত
প্রথম তাকবির
ইমাম “আল্লাহু আকবার” বলে তাকবির ঘোষণা করবেন এবং মুক্তাদিরাও একই সময়ে তাকবির বলবেন। তাকবির বলার সময় হাত কাঁধ পর্যন্ত তোলা উত্তম। তবে, যদি কেউ ভুলবশত হাত না তুলেন, তাতেও কোনো সমস্যা হবে না।
সানা: প্রথম তাকবিরের পর ইমাম এবং মুক্তাদিরা উভয়েই সানা পাঠ করতে হবে। সানা নীচে আরবি, বাংলা উচ্চারণ এবং অর্থসহ দেওয়া হলো:

আরো পড়ুন: নামাজে সূরা মিলিয়ে পড়ার নিয়ম
দ্বিতীয় তাকবির
ইমাম দ্বিতীয় তাকবির বলবেন এবং মুক্তাদিরাও একসঙ্গে তাকবির বলবেন।
দরুদ শরীফ পড়া : দ্বিতীয় তাকবিরের পর ইমাম এবং মুক্তাদিরা উভয়েই দরুদ শরিফ পাঠ করবেন। দরুদ শরিফের আরবি, বাংলা উচ্চারণ এবং অর্থসহ নিচে দেওয়া হলো-

বাংলা অর্থ:
হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সাঃ) এবং তাঁর পরিবারের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি ইব্রাহীম (আঃ) এবং তার পরিবারের ওপর রহমত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, মহিমান্বিত। হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সাঃ) এবং তাঁর পরিবারের ওপর বরকত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি ইব্রাহীম (আঃ) এবং তার পরিবারের ওপর বরকত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, মহিমান্বিত।
আরো পড়ুন: আয়াতুল কুরসি | Ayatul kursi bangla
তৃতীয় তাকবির
ইমাম তৃতীয় তাকবির বলবেন এবং মুক্তাদিরাও একই সময়ে তাকবির উচ্চারণ করবেন। তৃতীয় তাকবিরের পর, ইমাম এবং মুক্তাদিরা উভয়েই মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করবেন।
জানাজার নামাজে দোয়া
জানাজার নামাজে তৃতীয় তাকবিরের পর মৃত ব্যক্তির জন্য একটি বিশেষ দোয়া পাঠ করা হয়, যা নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর কাছ থেকে বর্ণিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দোয়া। এটিকে জানাজার নামাজের তৃতীয় দোয়া বলা হয়। নিচে জানাজার নামাজের দোয়া আরবিতে, বাংলা উচ্চারণ এবং অর্থসহ দেওয়া হলো:

বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের জীবিত ও মৃত সবাইকে, উপস্থিত ও গায়েবদের, ছোট ও বড়দের, নারী ও পুরুষ সবাইকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের মধ্যে যাকে জীবিত রাখবেন, তাকে ইসলামের ওপরই জীবিত রাখুন। যাকে মৃত্যু দিবেন, তাকে ইমানের সঙ্গেই মৃত্যু দিন। হে আল্লাহ! এই দোয়ার সাওয়াব থেকে আমাদের বঞ্চিত করবেন না এবং আমাদের পরবর্তীতে পথভ্রষ্ট করবেন না।
আরো পড়ুন: তাওবার নামাজ পড়ার নিয়ম
চতুর্থ তাকবির
ইমাম চতুর্থ তাকবির বলবেন এবং মুক্তাদিরাও একসাথে তাকবির উচ্চারণ করবেন।
জানাজার নামাজে মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে মাগফিরাত ও দোয়া প্রার্থনার করা হয়। জানাজার নামাজ মুসলিম সমাজের এক ঐক্যবদ্ধ ইবাদত, যা মৃতের আত্মার শান্তি এবং তার প্রতি আল্লাহর রহমত কামনা করা হয়।
জানাজার নামাজের ফজিলত
জানাজার নামাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। নিচে জানাজার নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত আলোচনা করা হলো:
জানাজার নামাজ পড়লে মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়: এটি জীবিতদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং তাদের আমল সংশোধন করার তাগিদ দেয়। এটি মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং নেক আমলের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
নবী (সাঃ) বলেছেন:
“তোমরা বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করো, কারণ এটি গুনাহ থেকে বিরত রাখে এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।”
নেকির সংখ্যা অধিক: রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
যে ব্যক্তি জানাজার নামাজ পড়বে, সে কিরাত পরিমাণ সওয়াব লাভ করবে। আর যে ব্যক্তি দাফন পর্যন্ত উপস্থিত থাকবে, সে দুই কিরাত পরিমাণ সওয়াব লাভ করবে।” সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল! কিরাত কী?” তিনি বললেন, “দুটো বিশাল পাহাড়ের সমান।
জানাজার নামাজ মুসলমানদের উপর হক: জানাজার নামাজ একটি মুসলিমের ওপর আরেক মুসলিমের কর্তব্য ও দায়বদ্ধতা। এটি আদায় করে একজন মুসলমান তার ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করে।
জানাজার নামাজ শুধুমাত্র মৃত ব্যক্তির জন্য নয়, এটি জীবিতদের জন্যও একটি শিক্ষা ও ফজিলতের মাধ্যম।
আরো পড়ুন: নামাজের রুকন
জানাজার নামাজ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর
জানাজার নামাজ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং উত্তর নিচে আলোচনা করা হলেো-
জুতা পায়ে জানাজার নামাজ পড়া যাবে কি
হ্যাঁ, জুতা পায়ে জানাজার নামাজ পড়া জায়েজ। তবে শর্ত হলো, জুতা ও পায়ের নিচের স্থান অবশ্যই পবিত্র হতে হবে।
মহিলারা কি জানাজার নামাজ পড়তে পারবেন
হ্যাঁ, মহিলারা জানাজার নামাজ পড়তে পারেন। ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলাদের জন্য জানাজার নামাজ পড়া বৈধ এবং এতে কোনো বাধা নেই।
রাসুল (সাঃ)-এর জানাজার নামাজ কে ইমামতি করেছিলেন
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জানাজার নামাজ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি ইমামতি করেননি; বরং সাহাবিরা দলে দলে পৃথকভাবে এসে জানাজার নামাজ আদায় করেন।
স্বপ্নে জানাজার নামাজ পড়তে দেখলে কী হয়
ইসলামে স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিশ্চিতভাবে করা কঠিন, তবে জানাজার নামাজ সম্পর্কিত স্বপ্ন সাধারণত মৃত্যু, তাওবা, ক্ষমা এবং আখিরাতের প্রস্তুতির বার্তা বহন করতে পারে। স্বপ্নে জানাজার নামাজ পড়ার বিভিন্ন ব্যাখ্যা হতে পারে, যেমন:- আত্মশুদ্ধি ও আত্মবিশ্লেষণের ইঙ্গিত, কোনো মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও মাগফিরাতের আহ্বান, জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, দুঃখ ও শোকের সম্ভাবনা।
জানাজার নামাজ ফরজ নাকি ওয়াজিব?
জানাজার নামাজ ফরজে কেফায়া, অর্থাৎ মুসলিম সমাজের মধ্যে কিছু লোক এটি আদায় করলে বাকিদের ওপর থেকে দায়িত্ব সরে যায়।
আরো পড়ুন: নামাজের আরকান আহকাম
উপসংহার
জানাজার নামাজের মাধ্যমে আমরা মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করি, তার গুনাহ মাফের আবেদন জানিয়ে আল্লাহর রহমত কামনা করি। এটি ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং মুসলিমদের প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।